Google search engine
প্রচ্ছদচট্টগ্রাম৪৪ বছর পর চাকসুতে শিবিরের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে বহু...

৪৪ বছর পর চাকসুতে শিবিরের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে বহু সমীকরণ

দীর্ঘ ৩৫ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত বুধবার (১৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন। আর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪৪ বছর পর চাকসুর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটলো ইসলামী ছাত্রশিবিরের। সংগঠনটির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল কেন্দ্রীয় সংসদের ২৬টি পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদকসহ (জিএস) ২৪টি পদেই নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় পেয়েছিল শিবির।

তিন যুগেরও বেশি সময় পর এই নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উত্তেজনা ছিল। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায়, ৭ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শিবিরের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন রনি। ৮ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে জয়ী হয়েছেন একই বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের দপ্তর সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব।

অন্যদিকে, এই নির্বাচনে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ৭ হাজার ১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন ছাত্রদলের প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক এবং সহ-খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ৪ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের তামান্না মাহবুব প্রীতি।

যেভাবে এলো ভূমিধস বিজয়

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভূমিধস বিজয়ের পেছনে গত এক বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শিবিরের সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পট পরিবর্তনের পর প্রায় এক দশক পর ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ফেরে ছাত্রশিবির। এই সময়ে তারা কোনো সংঘাত বা দখলদারিত্বের রাজনীতিতে না জড়িয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল রমজানে ফ্রি ইফতার, নবীনবরণ, কোরআন বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এসব কার্যক্রম সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘শিবিরকে তেমন কোনো সংঘর্ষে জড়াতে দেখিনি। বরং তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজির অভিযোগ নেই। এ কারণেই শিক্ষার্থীরা তাদের নির্বাচিত করেছেন।’

‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ এবারের নির্বাচনে অত্যন্ত পরিকল্পিত প্রচারণা চালায়। প্রতিটি অনুষদ ও আবাসিক হলে সরাসরি মতবিনিময়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা ছিল সক্রিয়। ইস্যুভিত্তিক পোস্ট, সংক্ষিপ্ত ভিডিও ও লাইভ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তারা নিজেদের ৩৩ দফা ইশতেহার শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী ও নারী শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল গঠন করাও তাদের জয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নবনির্বাচিত জিএস সাঈদ বিন হাবিব তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এই বিজয় ব্যক্তিগত নয়, ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিজয়। আমরা তখনই সফল হব, যখন আমাদের ৩৩ দফা ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে পারব। চাকসুকে কোনো দলীয় স্থান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চাই।’

ছাত্রদলের বিপর্যয় ও গোপন সমঝোতার গুঞ্জন

একদিকে শিবিরের নিরঙ্কুশ জয়ের বিপরীতে ছাত্রদলের ভরাডুবি ঘটেছে। এর কারণ হিসেবে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সমন্বয়হীনতা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুনকে বহিষ্কার করা এবং গত দুই বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে না পারা দলের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়।

তবে এর চেয়েও বড় গুঞ্জন উঠেছে ছাত্রলীগের ভোট নিয়ে। ক্যাম্পাসের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এক ‘গোপন সমঝোতা’র কথা। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন, ছাত্রলীগের ভোট একচেটিয়াভাবে শিবির সমর্থিত প্যানেলের বাক্সে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন সালাম মিঠু বলেন, ‘অতীতে ছাত্রলীগের যেসব নেতাকর্মী বিভিন্ন মামলার আসামি হয়েছেন, তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে ছাত্রলীগের ভোট শিবিরের পক্ষে গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাবেক চাকসু নেতা সালাহউদ্দিন মো. রেজা বলেন, ‘ডাকসুতে ছাত্রলীগ-শিবিরের গোপন যোগসাজশ ছিল। আমার ধারণা, চাকসুতেও একই সমঝোতার কারণে ছাত্রলীগের ভোট শিবিরের প্যানেলে গেছে। এছাড়া ছাত্রদলের এই ভরাডুবির পেছনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদাসীনতাও একটি বড় কারণ।’

তবে শিবিরের নবনির্বাচিত ভিপি মোহাম্মদ ইব্রাহিম হোসেন রনি এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর আস্থা রেখেছেন বলেই ভোট দিয়েছেন।

সাবেক নেতাদের প্রতিক্রিয়া

চাকসুর সাবেক নেতারা নবনির্বাচিত নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের চাকসু নির্বাচনের জিএস আজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শিবির তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও ঐক্যের জন্য জিতেছে। আর ছাত্রদল সমন্বয়হীনতা ও গ্রুপিংয়ের কারণে হেরেছে।’ তিনি কারচুপির অভিযোগকে अविश्वसनीय বলে মন্তব্য করেন।

চতুর্থ চাকসু নির্বাচনের ভিপি মজহারুল হক শাহ চৌধুরী বলেন, ‘আশা করি, সব মতের শিক্ষার্থীদের অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে কাজ করবেন নবনির্বাচিত নেতারা।’

চাকসুর ইতিহাস

১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ১৯৯০ সালের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্যানেল থেকে জাতীয় ছাত্রলীগের নাজিম উদ্দিন ভিপি এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আজিম উদ্দিন আহমদ জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর এবারের নির্বাচন ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

spot_img
spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত

এই বিভাগের আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম

সারাদেশ

বিশেষ-সংবাদ

বিনোদন