দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন করে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসবে ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌরবিদ্যুৎ থেকে এবং বাকি ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসবে ভূমিভিত্তিক প্রকল্প থেকে।
ছাদভিত্তিক উৎপাদনে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে কিনে নেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। তবে বিপুল এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং সরকারি পরিকল্পনার সফলতা নিয়ে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের মধ্যে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহক ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন, তাঁদের কাছ থেকে তিন বছর এই বিদ্যুৎ কেনা হবে। বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং পদ্ধতিতে বিতরণ সংস্থাগুলো এই বিদ্যুতের হিসাব রাখবে এবং তিন মাস অন্তর প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাদে প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুতের জন্য অন্তত ৭০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। সেই হিসাবে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার প্যানেল বসাতে ৭০০ বর্গফুট জায়গা লাগবে। ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ভবনের ছাদে এত জায়গা পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘এই নীতিমালায় এখনো অনেক অস্পষ্টতা রয়েছে। আবাসিক বহুতল ভবনগুলোতে অনেক ফ্ল্যাট মালিক থাকেন। নিজস্ব ব্যবহারের জায়গা এমনিতেই সীমিত, তার ওপর রুফটপ ব্যবহার করে কেউ লাভবান হবেন, তা প্রায় অসম্ভব। ব্যাটারিসহ বিনিয়োগ করতে গেলে লাভের কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকবে না।’
বর্তমানে কিলোওয়াটপ্রতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০-৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। তিন কিলোওয়াট সক্ষমতা তৈরি করলে মাসে প্রায় ৪০০ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, যার জন্য প্রাথমিক খরচ পড়বে দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবহারের শর্ত দিলে এই খরচ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ টাকায়।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘সরকার চাচ্ছে ব্যাটারি স্টোরেজ ও রুফটপ সোলার একসঙ্গে থাকুক। এতে সার্বিক খরচ বেড়ে যাবে। সরকার নেট মিটারিং থেকে নেট বিলিং পদ্ধতিতে যেতে চাইছে, কিন্তু ফিড-ইন ট্যারিফে গেলে সেটি গ্রাহকদের জন্য বেশি লাভজনক হতো। ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন খরচ পড়বে ১৩-১৪ টাকা, সেখানে সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি করা ছোট পরিবারগুলোর জন্য মোটেও লাভজনক নয়।’
ক্রেতাদের শর্ত অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানায় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক। সিপিডির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যার জন্য প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিজিএমইএ-এর এনার্জি অপটিমাইজেশন বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান নিশাত নাহরিন হামিদ জানান, তাঁদের জরিপে ৪৫৩টি ছোট-বড় কারখানা রুফটপ সোলার স্থাপনে আগ্রহী, যার সম্মিলিত সক্ষমতা হতে পারে ১৬৫-১৭০ মেগাওয়াট। তবে মূল সমস্যা হলো সহজ শর্তে ঋণ বা বিনিয়োগ পাওয়া।
লক্ষ্য পূরণে বিশেষজ্ঞদের ৫ প্রস্তাবনা:
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সফল করতে এবং ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ক্লিন-এর প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী:
১. সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ৫ শতাংশের কম সুদে ঋণ সরবরাহ করা এবং মোট খরচের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।
২. প্রি-ফাইন্যান্সিং বা প্রাক-অর্থায়নের ব্যবস্থা করা।
৩. সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা।
৪. দেশীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সোলার খাতে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ মওকুফ করা।
৫. বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে ‘ফিড-ইন ট্যারিফ’ পদ্ধতি চালু করা।
ভূমিভিত্তিক ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ জানান, ছাদ ও ভূমিভিত্তিক প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগবে, যা দেশীয় ব্যাংকগুলোর একার পক্ষে জোগান দেওয়া অসম্ভব।
তবে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি বিশেষ আইনে অনুমোদন পাওয়া ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান গ্রিড ব্যবস্থায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ১০ শতাংশের বেশি নেওয়ার সক্ষমতা নেই, তাই অবিলম্বে স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


