দীর্ঘ সায়ত্রিশ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) অনুষ্ঠিত হলো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরের ইতিহাসে এটি ১৭তম নির্বাচন হলেও ১৯৯০ সালের পর আর কোনো ছাত্র সংসদ দেখেনি এই বিদ্যাপীঠ। দীর্ঘ এই অচলায়তন ভাঙার নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ, যার প্রতিফলন ঘটেছে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট প্রয়োগের মধ্য দিয়ে।
তবে বহুল কাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে একটি মিশ্র চিত্র। শীর্ষ দুটি পদে (ভিপি ও জিএস) জয় পেয়েছেন ভিন্ন দুই প্যানেলের প্রার্থী। সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের মোস্তাকুর রহমান (জাহিদ)। অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেলের সালাউদ্দিন আম্মার।
আজ শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম।
ফলাফলে দেখা যায়, ভিপি পদে মোস্তাকুর রহমান (জাহিদ) পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৮৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের শেখ নূর উদ্দিন (আবির) পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৯৭ ভোট।
বিপরীতে, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার পেয়েছেন ১১ হাজার ৪৯৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, শিবির-সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী ও এই আন্দোলনের আরেক সাবেক সমন্বয়ক ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজা পেয়েছেন ৫ হাজার ৭২৭ ভোট।
শীর্ষ পদে এই বিভক্তি থাকলেও সংসদের সামগ্রিক চিত্রে নিরঙ্কুশ আধিপত্য দেখিয়েছে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। রাকসুর মোট ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পেয়েছে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থীরা। সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদেও জয়ী হয়েছেন এই প্যানেলের এস এম সালমান সাব্বির; তিনি পেয়েছেন ৬ হাজার ৯৭৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের জাহিন বিশ্বাস (এষা) পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৫১ ভোট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেল। এসব নির্বাচনেও ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলগুলোর অভাবনীয় সাফল্য ছাত্র রাজনীতির এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি ভবনের ১৭টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ২৮ হাজার ৯০১ জন ভোটারের মধ্যে ৬৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনে ১০টি প্যানেলসহ রাকসুর ২৩ পদে ২৪৭ জন এবং হল সংসদে ৫৯৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ফলাফল ঘোষণার সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে এই নির্বাচন আয়োজনের পেছনের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কঠোর ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের কারণে এ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়েছে। উপাচার্য মহোদয় বলেছিলেন, নির্বাচন হতেই হবে, হতেই হবে। ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ও ফলাফল আমি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের উৎসর্গ করলাম।’
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব, সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন খান ও অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল আলীম এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।


