Google search engine
প্রচ্ছদচট্টগ্রামসরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম এর এইচএসসি ১৯৯৩ ব্যাচ বন্ধুদের...

সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম এর এইচএসসি ১৯৯৩ ব্যাচ বন্ধুদের মিলনমেলা

জে আর সোহেলঃ একটাই কথা আছে বাংলাতে/মুখ আর বুক বলে একসাথে/সে হলো বন্ধু, বন্ধু আমার। ১৯৯৩ সালে সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম থেকে যে সব ছাত্র-ছাত্রী পাস করেছিল, গানের এই কথাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিয়ে তারা বন্ধুত্বের টানে, বন্ধুদের ভালোবাসায় সারা দিতে আবার চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিল । “বন্ধুত্বের বন্ধন আজীবন” এই শ্লোগানকে অন্তরে ধারণ করে গেল নভেম্বর ২৯, ২০২৫ তারিখ চট্টগ্রাম অফিসার্স ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম এর এইচএসসি ১৯৯৩ ব্যাচের বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের বন্ধুদের নিয়ে জমকালো এক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান।

ঘোষনামোতাবেক ঠিক বিকাল চারটায় আমন্ত্রিত বন্ধুদেরকে অভ্যর্থনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। এরপর একে একে সকল বন্ধুকে অনুষ্ঠানের স্যুভেনির, উপহার বুঝিয়ে দেয়া হয়। যার মধ্যে ছিল চমৎকার একটি টিশার্ট, সুদৃশ্য মগ, রিইউনিয়নের লোগো সম্বলিত তোয়ালে, কোটপিন, চাবির রিং ইত্যাদি। সাথে পরিবেশন করা বাহারি সুস্বাদু নাস্থা।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বরণ করা হয় সেসব বন্ধুকে যারা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত, গীতা ও ত্রিপিটক পাঠ শেষে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। আয়োজক কমিটির আহবায়ক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন উপস্থিত সব বন্ধুদের নিয়ে কেক কেটে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

রিইউনিয়ন অনুষ্ঠান আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, “কলেজ থেকে বের হবার প্রায় বত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। এরই মাঝে বিভিন্ন জন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে বিভিন্ন স্থানে। নানা ব্যস্ততার কারণে এখন আর আগের মত সবার মধ্যে যোগাযোগটা সেভাবে ছিলনা। তাই অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ সংখ্যক বন্ধুর অংশগ্রহনের চ্যালেঞ্জেকে সামনে নিয়েই এবারের রিইউনিয়ন আয়োজন করা হয়। কিন্তু সবার সাথে যোগাযোগ করার কাজটা ছিল খুবই কঠিন। কেননা অনেকের সাথে দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবাদটা পৌঁছানো যাচ্ছিলনা। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করেছে। সব বাঁধা পেরিয়ে অবশেষে আমরা প্রায় ২১০ জন সহপাঠীর রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে সক্ষম হই।“

রিইউনিয়নে অনেকেই এসেছিল যাদের বর্তমানে চট্টগ্রামের সাথে তেমন সম্পর্কই নেই। শুধু মাত্র পুরনো বন্ধুদের সাথে একটা দিন অতিবাহিত করবে বলেই তারা ছুটে এসেছিল চট্টগ্রাম অফিসার্স ক্লাবে। আবার দুর্ভাগ্যবশত রেজিষ্ট্রেশন করার পরও কয়েকজন বন্ধুর অনুষ্ঠানে আসা হয়ে ওঠেনি। তাদের মধ্যে অনেকেই টেক্সট পাঠিয়ে অনুষ্ঠান মিস করার দুঃখানুভুতিও প্রকাশ করেছেন।

সময়ের পরিক্রমায় সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম এর এইচএসসি ১৯৯৩ ব্যাচের ছাত্ররা এখন বাংলাদেশ সচিবালয়সহ দেশের নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। অবদান রাখছেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি ও গবেষণায়। কেউ কেউ বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। আবার অনেকেই থিতু হয়েছেন আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় অনেকেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলার অপেক্ষা রাখেনা, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী বন্ধুর উপস্থিতি সমগ্র অনুষ্ঠানের জৌলুস অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল।

মাগরিব নামাযের বিরতির পর বন্ধুদের পরিচিতির মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। পরিচিতি পর্ব শেষে সবার সামনে উন্মোচন করা অনুষ্ঠানের স্মারক ম্যাগাজিন “৯৩ৎসব ২০২৫”। ম্যাগাজিনটিতে আহবায়ক, সম্পাদক ও সদস্য সচিবের কথা সহ শুভেচ্ছা বাণী প্রদান করেন সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রামের প্রাক্তন অধ্যক্ষ এবং ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও ফাইন্যান্সিয়াল এডভাইজার প্রফেসর সামস উদ দোহা, সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রামের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু সালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন। “স্মরণে আবরণে মরণেরে যত্নে রাখে ঢাকি” নামে শুক্লা ইফতেখার (১৯৯৩ সালে কলেজের অত্যন্ত জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষিকা ‘শুক্লা ম্যাম’) তাঁর নান্দনিক লেখন শৈলীর মাধ্যমে তুলে ধরেন আরেক জনপ্রিয় শিক্ষক প্রফেসর ইফতেখার আহমদ খান প্রয়ানের এক মর্মস্পর্শী বিয়োগ গাঁথা। তাছাড়া বন্ধুদের ছবিসহ পরিচিতি, বিভিন্ন লেখা ও স্মৃতির পাতা থেকে তুলে আনা পুরনো দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি সন্নিবেশের মাধ্যমে ম্যাগাজিনটির প্রকাশনা হয়ে ওঠে অনবদ্য।

এরপর শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একে একে আজম খান, হ্যাপি আকন্দ, কুমার বিশ্বজিত, রেনেসাঁ, কিশোর কুমার, পংকজ উদাস, লতা মঙ্গেশকররা উপস্থিত হয়েছিলেন ’৯৩ এর বন্ধু জনপ্রিয় গায়ক জাহেদ, প্রিয়াঙ্কা, রিংকু ও সহ শিল্পীদের গলায় ভর করে। উপস্থিত বন্ধুরাও তাদের গানের তালে নেচে গেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হলো। “ডিফারেন্ট টাচ” ব্যান্ডের “শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হল আকাশে” গান শুরু হওয়ার সাথে সাথে সেই আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়লো সারা হলে। মনে হচ্ছিল সবাই যেন সেই ৯০ দশকের কলেজ জীবনে ফিরে গেছে। পুরনো বন্ধুদের পেয়ে গানের ফাঁকে আড্ডা, স্মৃতিচারণ, ফটোসেশনও চলতে থাকে সমানতালে।

পুনর্মিলনী আয়োজক কমিটির আহবায়ক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের ’৯৩ সালের বন্ধুদেরকে যতটুকু পারি একসাথ করার জন্য, এক্টু আড্ডা দেওয়ার জন্য। ১৯৯৩ সালে আমরা যেভাবে ক্যাম্পাসে ছিলাম, যেভাবে বন্ধুদের সাথে মিশেছি, চেয়েছিলাম ঐ রকম একটা দিন আজকে যেন হয়। আমাদের ঐকান্তিক চেষ্টা কিছু সময়ের জন্য হলেও সেই সময়টাকে আবার ফিরিয়ে আনা।“

এ পুনর্মিলনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল “র‍্যাফেল ড্র”। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে লটারি পর্ব। ডায়াস থেকে একটি নম্বর ঘোষণা করা হয়, আর সাথে সাথে সারা হল উল্লাসে ফেটে পড়ে। পুরস্কার নিয়ে খুনসুটিতে মেতে উঠে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর সাথে। কেউ একজনের পুরস্কার অন্যজনে নিয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে যায়। আবার কেউবা পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ ভাগাভাগির জন্য ছবি তুলে স্ত্রীর কাছে তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দেয়। সে এক অপূর্ব দৃশ্য!

পরিশেষে নৈশভোজ, গ্রুপ ফটোসেশন এবং সমাপনী সঙ্গীতের মাধ্যমে সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম এর এইচএসসি ১৯৯৩ ব্যাচে এর “রিইউনিয়ন ২০২৫” অনুষ্ঠানের পর্দা নামে। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণায় আহবায়ক বলেন, “আমাদের আয়োজনের কাজটাকে সহজ এবং অনুষ্ঠান সফল করেছে সবার আন্তরিকতা। সে জন্য আমি সবার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে আমাদের সরকারি সিটি কলেজের এইচএসসি ১৯৯৩ ব্যাচ এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। এবং ব্যাক্তিগত যোগাযোগ বৃদ্ধি ও দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য আমাদের বন্ধুদের এই প্ল্যাটফর্ম থেকে “১৯৯৩ ক্লাব” নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।“

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আমেরিকা প্রবাসী মাসুদ চৌধুরী, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এটিএম সাদেকুল ইসলাম, ফিনল্যান্ড প্রবাসী ভুঁইয়া নুরের জামান, বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী আহমেদ আহসান সাইফ, এডভোকেট কানিজ কাউসার চৌধুরী রিমা, যুক্তরাজ্য প্রবাসী মোহাম্মাদ নাজিম উদ্দীন, ডাক্তার মোহাম্মদ বেলাল উদ্দীন, কেএসআরএম এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মোঃ সেলিম উদ্দীন, স্টাডি নেট এর গ্লোবাল ম্যানেজার (এইচআর) সায়রা শহিদ, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মোহাম্মাদ ইউছুপ, যুগ্ন সচিব শেখ মোহাম্মাদ তৌহিদুল ইসলাম, বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী কে এম মাসুম রেজা, স্পেন প্রবাসী সালাহ উদ্দীন এবং আমেরিকা প্রবাসী আশফাককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়।

spot_img
spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত

এই বিভাগের আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম

সারাদেশ

বিশেষ-সংবাদ

বিনোদন