Google search engine
প্রচ্ছদচট্টগ্রামচট্টগ্রামের আতঙ্ক: বিদেশে বসে খুনের রিমোট কন্ট্রোল যার হাতে

চট্টগ্রামের আতঙ্ক: বিদেশে বসে খুনের রিমোট কন্ট্রোল যার হাতে

বুধবারের সন্ধ্যা। চট্টগ্রামের চালিতাতলী এলাকা। নির্বাচনী গণসংযোগের ভিড়ে মিশে ছিল আততায়ী। ভিড়ের মধ্যেই একজন পিস্তল ঠেকালো সরোয়ার হোসেন বাবলার ঘাড়ে। একটি মাত্র গুলির শব্দ। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়লেন একসময়ের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাবলা।

এই হত্যাকাণ্ডটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের এক রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার বলয়ের সর্বশেষ অধ্যায়। বাবলা ছিলেন বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের একসময়ের ডানহাত। মাত্র ছয় মাস আগে, গত ২৩ মে, খুন হন সাজ্জাদের আরেক বিশ্বস্ত শিষ্য আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর। অভিযোগের আঙুল দুটি খুনেই স্বয়ং ‘গুরু’ বড় সাজ্জাদের দিকে। একসময় যারা তাঁর সাম্রাজ্য চালাতো, তারাই প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠায় তাদেরকেই কি ঠান্ডা মাথায় সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে?

বিদেশে ‘বস’, দেশে আতঙ্ক-নেটওয়ার্ক

নাম তার বড় সাজ্জাদ। থাকেন বিদেশে, কিন্তু তার অদৃশ্য হাত যেন নিয়ন্ত্রণ করছে চট্টগ্রামের এক বিশাল অপরাধজগৎ। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ থেকে শুরু করে জেলার হাটহাজারী ও রাউজান—এই পাঁচ থানার প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ সাজ্জাদ বাহিনীর কাছে জিম্মি। পুলিশের তথ্যমতে, চাঁদা না দিলেই মেলে গুলি। ৫ আগস্টের পর থেকে নগর ও জেলায় ঘটা দশটি খুনের সাথে জড়িয়ে আছে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম। কখনো আধিপত্যের লড়াই, কখনো বা ভাড়াটে খুনি হিসেবে তাদের বিচরণ সর্বত্র।

এই সাজ্জাদ আলীর উত্থান বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকা থেকে। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান হত্যায় তার নাম আসে। সাক্ষীর অভাবে খালাস পেলেও অপরাধজগতে পরিচিতি পেয়ে যান। এরপর ২০০০ সালে বহদ্দারহাটের সেই ভয়াবহ ‘এইট মার্ডার’, যেখানে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়, সেই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে সাজ্জাদের নাম ওঠে। ২০০৪ সালে জামিনে বেড়িয়ে দেশ ছাড়েন তিনি, কিন্তু তার অপরাধের সাম্রাজ্য সচল রাখেন প্রক্সি যোদ্ধাদের মাধ্যমে।

‘ছোট সাজ্জাদ’ ও ‘ঘাতক’ রায়হানের উত্থান

শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়া হয়েছিল এই বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান। সরোয়ার ও আকবর বিদ্রোহী হওয়ায় খুন হলেন। এরপর ২০১৫ সাল থেকে দলের হাল ধরেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।

পুলিশ জানায়, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে এখন অন্তত ২৫ জন সক্রিয় সন্ত্রাসী। মূল নেতৃত্বে ছিলেন ১৭ মামলার আসামি ছোট সাজ্জাদ। তিনি সম্প্রতি কারাগারে গেলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান। এই দলে আরও সক্রিয় আছেন মো. খোরশেদ, মোহাম্মদ, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মোহাম্মদ ওরফে ভাতিজা মোহাম্মদ, ববি আলম, মো. কামাল, মো. হাসান, নুরুল হক, মোহাম্মদ বোরহান, মো. মবিন, মোবারক, মো. কাদের, মো. তপু, মো. আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক, এরশাদ, ওসমান আলী ও মো. আলভীন। পুলিশ বলছে, প্রত্যেকেই অস্ত্র চালনায় পারদর্শী এবং বিদেশের ‘বস’-এর এক ফোনেই তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

“খুলি উড়ায় ফেলব… আকবর সি বিচে কীভাবে পড়ে ছিল দেখেছিস?”

“সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।”—এই কথা বলেই গত ১ আগস্ট চান্দগাঁওয়ের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুসের শরীরে চারটি গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও সেই রাতের আতঙ্ক ভোলেননি তিনি। হাটহাজারীর আবাসন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে চাওয়া হয়েছিল ৫০ লাখ টাকা। না দেওয়ায় তার বাড়ি লক্ষ্য করে চলে গুলিবর্ষণ।

এই প্রতিটি ঘটনাতেই ঘুরেফিরে আসছে মোহাম্মদ রায়হানের নাম। সরোয়ার হত্যায় সরাসরি রায়হানের সম্পৃক্ততার দাবি করছে পুলিশ ও নিহতের পরিবার। গত ২৫ জুলাই কালুরঘাটের এক ওষুধের দোকানিকে তার দেওয়া হুমকিটি ছিল ভয়াবহ: “আমি ঢাকাইয়া আকবর খুনের মামলার ২ নম্বর আসামি রায়হান, মাথার খুলি উড়ায় ফেলব… আকবর সি বিচে কীভাবে পড়ে ছিল তুই দেখেছিস? তুইও পড়ে থাকবি।”

বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল জানান, রায়হান কথায় কথায় গুলি ছোড়েন এবং অপরাধ ঘটিয়ে দ্রুত রাউজান বা ফটিকছড়ির পাহাড়ি আস্তানায় পালিয়ে যান। বড় সাজ্জাদের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েই তিনি দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠেন।

সাজ্জাদের আরেক সহযোগী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। ফটিকছড়ির কাঞ্চনগরের মো. মুসার ছেলে। জোড়া খুন ও ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ সাত মামলার আসামি। পুলিশ জানিয়েছে, তার পুরোনো ছবিতে ১৫-২০টি অস্ত্র বহনের প্রমাণ রয়েছে।

কারাগারে বসেও ‘আলোচনায়’ ছোট সাজ্জাদ

হাটহাজারীর শিকারপুর এলাকার মো. জামালের ছেলে ছোট সাজ্জাদ চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েই অপরাধে জড়ান। গত বছরের ২৯ আগস্ট প্রতিপক্ষ সরোয়ারের সহযোগী মো. আনিস ও কায়সারকে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় গুলি করে খুন করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ৪ ডিসেম্বর পুলিশ ধরতে গেলে তাদের ওপর গুলি করে পালিয়ে যান, আহত হন দুই পুলিশ সদস্য।

এমনকি গত ২৯ জানুয়ারি তিনি ফেসবুকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানকে প্রকাশ্য অক্সিজেন এলাকায় পেটানোর হুমকি দেন। পরে ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্ত্রী তামান্না শারমিন তখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, সাজ্জাদকে ছাড়াতে বান্ডিল বান্ডিল টাকা ছিটানো হবে। সেই ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকলেও তার নির্দেশেই সহযোগীরা একের পর এক খুন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগ অস্বীকার ‘বড়’ বসের

এতসব অভিযোগের বিষয়ে কী বলছেন স্বয়ং বড় সাজ্জাদ? মুঠোফোনে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি বিদেশে ব্যবসা করেন এবং দেশে ভাড়া ঘর থেকেই তার অনেক আয়। পরিবার বিত্তশালী হওয়ায় চাঁদাবাজির প্রয়োজন নেই। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসীরাই তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সাজ্জাদ (ছোট) বা রায়হানের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই বলেও তিনি জানান, তবে সরোয়ার যে ‘সন্ত্রাসী’ সেটি তিনি জানতেন।

নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ স্বীকার করেছেন, এক শীর্ষ সন্ত্রাসী (ছোট সাজ্জাদ) কারাগারে থাকলেও তার সহযোগীরা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়া ‘গুরু’-কেও ফিরিয়ে আনার চেষ্টার কথা জানান তিনি।

কিন্তু এই আশ্বাসে কি ভয় কাটছে? জোড়া খুনে নিহত আনিসের স্ত্রী অ্যানী আকতারের কথায়ই যেন ফুটে ওঠে পুরো চট্টগ্রামের হতাশা— “এক বছরেও স্বামীর প্রকৃত খুনিদের ধরতে পারেনি পুলিশ, যার কারণে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে।”

spot_img
spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত

এই বিভাগের আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম

সারাদেশ

বিশেষ-সংবাদ

বিনোদন