একসময় চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায় যার নাম ছিল প্রতাপের সমার্থক, সেই সাইফ পাওয়ারটেক এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে তরফদার রুহুল আমিনের এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল অপ্রতিরোধ্য। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বন্দরের প্রায় প্রতিটি বড় প্রকল্পে ছিল তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সাইফ পাওয়ার এখন অনেকটাই শক্তিহীন। টিকে থাকার এই কঠিন সময়ে তারা আশ্রয় নিয়েছে এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার প্রতিষ্ঠানের ছায়াতলে, যা নিয়ে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জট নিরসনের অজুহাতে নগরীর হালিশহরে রেলওয়ের ২১ দশমিক ২৯ একর জমিতে একটি মাল্টিমোডাল কনটেইনার টার্মিনাল (অফডক) নির্মাণের কাজ পায় সাইফ পাওয়ার গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সাইফ লজিস্টিক অ্যালায়েন্স। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতিষ্ঠান কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজটি শুরু করে তারা।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে বিতর্কের মূল। চট্টগ্রাম বন্দরের ২০১৬ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২১ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, যানজট এড়াতে বন্দরের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো অফডক নির্মাণের সুযোগ নেই। অথচ এই প্রকল্পটি বন্দর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক এবং পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম উভয়েই স্বীকার করেছেন, সিসিবিএল একটি সরকারি সংস্থা হওয়ায় সে সময়ে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ এই ছাড় দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, শুরু থেকেই নিয়মকে পাশ কাটানোর একটি প্রবণতা ছিল স্পষ্ট।
শুধু নীতিমালার লঙ্ঘনই নয়, প্রকল্পটি স্থানীয় ধর্মীয় অনুভূতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। প্রস্তাবিত ডিপোর জায়গায় রয়েছে একটি শতবর্ষী মসজিদ, একটি মাজার এবং সাড়ে চার শতাধিক কবরসহ একটি পুরনো কবরস্থান। এই কবরস্থানে রেলওয়ের প্রয়াত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের স্বজনদের দাফন করা হয়। ডিপোর নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা ও রেলওয়ে কর্মচারীদের মধ্যে উচ্ছেদ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জাতীয়তাবাদী রেল শ্রমিক দল জেটি শাখার সভাপতি সাবের আহমদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “রেলের উন্নয়ন হোক, আমরাও চাই। কিন্তু মসজিদ, মাজার ও আমাদের পূর্বপুরুষদের কবরস্থানের জায়গা দখল করে ডিপো নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।” সিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়াজাহান অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, কবরস্থান ও মসজিদকে অক্ষত রেখেই ডিপোর কাজ করা হবে এবং প্রয়োজনে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ পুনর্নির্মাণ করা হবে। তবে স্থানীয়রা এই আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না।
২০২২ সালে কাজ শুরু হলেও নানা জটিলতায় প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল সামান্যই। এর মধ্যে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকারের পরিবর্তনের পর তরফদার রুহুল আমিনের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে ভাটা পড়তে শুরু করে। একে একে হাতছাড়া হতে থাকে বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ঢাকা আইসিডির মতো বড় কাজ। মোংলা বন্দরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে যায়। ব্যাংক থেকেও নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতেই হালিশহরের এই বিতর্কিত প্রকল্পে রাতারাতি বদলে যায় সাইনবোর্ড। সাইফ লজিস্টিকসের নামের জায়গায় এখন শোভা পাচ্ছে ‘কিউসি কনটেইনার টার্মিনাল অ্যান্ড লজিস্টিকস লিমিটেড’-এর নাম। এই কিউসি গ্রুপ বিএনপির প্রয়াত প্রভাবশালী নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের মালিকানাধীন। বর্তমানে এর নেতৃত্বে রয়েছেন তার ভাই এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই সাইফ পাওয়ারটেক এই রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এখন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কিউসি গ্রুপকে সামনে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই অদ্ভুত জোট নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে কানাঘুষা। এ বিষয়ে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি আমি পুরোপুরি জানি না। আমার ছেলে হালিশহরে রেলওয়ে ডিপোটির কাজ করছে।”
তবে সিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়াজাহান নিশ্চিত করেছেন, “কিউসি সাইফের সঙ্গে পার্টনার হচ্ছে। তারা সাইফের কন্ট্রাক্টর কাম টার্মিনাল অপারেটর হিসেবে ওখানে আসছে।” তিনি আরও স্বীকার করেন, পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় সাইফ পাওয়ারের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিন এখন ‘বিপদের মধ্যে’ আছেন।
এই বিষয়ে মূল অভিযুক্ত সাইফ লজিস্টিকসের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এই নীরবতা পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। ক্ষমতার পালাবদলে ব্যবসায়িক স্বার্থ কীভাবে রাজনৈতিক আবরণ খোঁজে, হালিশহরের এই প্রকল্পটি তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এবং স্থানীয়দের অনুভূতিকে অগ্রাহ্য করে গড়ে ওঠা এই ডিপোর ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়ায়।


